জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ - James Webb Space Telescope
বিজ্ঞানীদের ধারণা, ১৫ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের এই মহাবিশ্ব একটি অসীম অথবা অতি ক্ষুদ্রাকার ভরসম্পন্ন অতি উত্তপ্ত বিন্দুতে পুঞ্জীভূত ছিল। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি (Singularity) এরপর মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যবধানে ঘটল বিরাট ও অকল্পনীয় এক বিস্ফোরণ। ইতিমধ্যে তাপমাত্রা নেমে এল প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াসে। মূলত এটাই ছিল বিগ ব্যাং। এরপর তিন শ হাজার বছর পেরিয়ে গেল। মহাবিশ্বের তাপমাত্রা এমন একটি পর্যায়ে নেমে আসল, যেটা পরমাণুর (Atom) গঠন তৈরি করতে লাগল। মহাবিশ্বের প্রথম পরমাণু ছিল ক্ষুদ্রতম হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম।
হাইড্রোজেন পরমাণুতে বিদ্যমান থাকে একটিমাত্র ইলেকট্রোন, যেটি আরেকটি প্রোটনকে কেন্দ্র করে ঘুর্ণায়মাণ। অপরদিকে হিলিয়ামে আছে দুইটি ইলেকট্রোন, যেটা অপর দুটি নিউট্রন ও দুটি প্রটোনকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।
এর আরও প্রায় এক মিলিয়ন বছর পরের কথা। আমাদের সদ্যোজাত মহাবিশ্ব তখনো কোনো গ্রহের জন্ম দেয়নি। শুধুমাত্র অতি উত্তপ্ত মেঘ ও ধুলিকণায় পূর্ণ ছিল। আর এই মেঘ ও ধুলিকণায় বিদ্যমান ছিল ৯৮% হাইড্রোজেন ও ২% হিলিয়াম। আর এটাকে আমরা বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে থাকি নেবুলা। আরও প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর অতিবাহিত হলো। কালের আবর্তনে যে নেবুলার জন্ম হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে শুরু হলো একধরনের ফিউশন রিঅ্যাকশন। ফিউশন রিঅ্যাকশন হলো যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষুদ্র পরমাণুগুলো পরস্পর সংঘর্ষ করে বৃহদাকার পরমাণুতে পরিণত হয়। পাশাপাশি নেবুলার প্যাটার্ন ও সাইজও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকল। এমন একটি পর্যায় এল যখন নেবুলা এক ধরনের বৃত্তাকার চাকতির মতো গঠন প্রাপ্ত হতে লাগল। এই চাকতি সদৃশ রিংয়ের কেন্দ্রস্থলে আবির্ভাব হতে লাগল এক অতি বৃহৎ আকৃতির গোলাকার বল। যতক্ষণ না পর্যন্ত ফিউশন রিঅ্যাকশন শুরু হতো ততক্ষণ পর্যন্ত এই দানবীয় বলটি অত্যন্ত উত্তপ্ত হতে থাকত। আর সেই দানবীয় উত্তপ্ত বলটি হলো আমাদের আজকের সূর্য।
অন্যদিকে যেই চাকতি সদৃশ রিংগুলো গঠিত হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে শুরু হতে থাকল অতি মাত্রার সংঘর্ষ। বস্তুত এই সংঘর্ষগুলো ঘটত নানা ধরনের কণা ও ধূলিকণার মধ্যে। আর সময়ের ধারাবাহিকতায় এই সংঘর্ষে জন্ম নেয় নয়টি গ্রহ —মার্কেউরী, ভেনাস, আর্থ (আমাদের পৃথিবী), মার্স, জুপিটার, স্যাটার্ন, ইউরেনাস, নেপচুন ও প্লুটো।
আর হ্যাঁ, এগুলোর মধ্যে একটি, যেটিতে আমরা আজ সবাই আছি, সেটা আমাদের পৃথিবী। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়...। এই সৌরজগত সৃষ্টির আরও ৩০ মিলিয়ন বছর পর, আমাদের পৃথিবী গ্রহের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় মঙ্গল গ্রহের সম আকৃতির গ্রহগুলো। জন্ম নিল নতুন উপগ্রহের। এর একটি হলো আমাদের চাঁদ।
এই যে, আমাদের এই পৃথিবী আর মহা বিশ্ব সৃষ্টির এই দীর্ঘ গল্প, কিংবা সেই বিলুপ্ত ডায়নাসর, এর সবকিছুই নাকি দেখা যাবে, আমাদের আজকের নায়ক জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপে, এজন্যই একে অনেকেই টাইম মেশিন আখ্যা দিচ্ছেন।
তো চলুন কথা না বাড়িয়ে, James Webb Space Telescope- মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, বিজ্ঞানের বিস্ময় এই দূরবীক্ষণটি সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক কিছু কথা।
কিংবদন্তী মহাকাশ দূরবীন 'হাবল' এর উত্তরসূরি হিসেবে তৈরি হয়েছে 'জেমস ওয়েব'। ১৯৯৬ সালে দূরবীনটির জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির বিকাশ ও দূরবীনটি তৈরির কাজ শুরু হয়। এই প্রজেক্টে হাত মিলিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আমেরিকা ও ইউরোপের মোট ২০ টি দেশ। নির্মাণের দায়িত্ব নরথ্রপ গ্রুমান ও বল এরোস্পেস কোম্পানির।
২০১৯ এর অক্টোবর পর্যন্ত হিসেব অনুযায়ী প্রজেক্টটিতে খরচ হয়ে গেছে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একে সেই ২০২০ সালে পাঠানোর কথা থাকলেও, অনেক নাটকীয়তার পর অবশেষে ২০২১ এর ২৫ ডিসেম্বর একে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে ।
উদ্দেশ্যঃ দৃশ্যমান ও অবলোহিত আলো বিকিরণকারী মহাজাগতিক বস্তুসমূহ পর্যবেক্ষণ। ব্রহ্মাণ্ডসৃষ্টির আদিম অবস্থা থেকে শুরু করে নীহারিকার অভ্যন্তরে নতুন নক্ষত্রের জন্মপ্রক্রিয়া এমনকি বহুদূরবর্তী ভীনগ্রহের বায়ুমণ্ডলের উপাদান বিশ্লেষণ (যা থেকে বহির্জাগতিক প্রাণের খোঁজ মেলারও আশা রয়েছে)- এইসবকিছুতেই অত্যন্ত দক্ষ হবে জেমস ওয়েব।
প্রযুক্তিঃ
কী আশ্চর্য পর্যায়ের প্রযুক্তি এই দূরবীনে ব্যবহার হচ্ছে তা লিখে শেষ করাই কঠিন। আমি অতি সংক্ষেপে অতি সরলীকৃতভাবে কিছু বলছি।
১) সৌর আচ্ছাদনঃ সূর্যের আলো ও তাপ থেকে বাঁচার জন্য ওয়েবের রয়েছে ৫ টি সৌর আচ্ছাদন স্তর যার একেকটি মানুষের চুলের সমান পুরু। এটাকে ১২ বার ভাঁজ করে রাখা আছে (নাহলে রকেটে আঁটবে না) যাকে মহাকাশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খোলার ব্যবস্থাও রয়েছে। এই ভাঁজ করা বা খোলার প্রযুক্তি অত্যন্ত জটিল।
২) আয়নাঃ ওয়েবের আয়না হাবলের থেকে আকারে অনেক বড়। ব্যাস ৬.৫ মিটার। এটিকেও মুক্ত অবস্থায় রাখলে রকেটে আঁটবে না। তাই এটি আসলে ১৮ টি ষড়ভুজ অংশকে যুক্ত করে তৈরি যাদের সূক্ষ্ম মোটরের সাহায্যে ভাঁজ করা বা খোলা যায়।
একটি মিরর সেগমেন্টঃ
রঙটা সোনালী কেন বলুন তো? হ্যাঁ, ওটা আসলেই একটা সোনার স্তর।
এর ১৮ টি ষড়ভুজকে রোবটিক্সের সাহায্যে জোড়া হয়েছে।
গোটা দূরবীনকে কতখানি সূক্ষ্ম হতে হবে সেটা বলতে গেলে আলাদা একটা ডকুমেন্টারি চাই। প্রজেক্টটি কতটা শক্ত সেটা বোঝাতে শুধু এটুকু বললেই হয়ঃ হাবলের উৎক্ষেপণের পরেই দেখা গেছিল তার সিঙ্গল মিররে অতিসূক্ষ্ম একটা সমস্যার কারণে ছবি অপরিস্কার আসছে। তার জন্য নাসা-কে একটা ঐতিহাসিক মানব অভিযান চালাতে হয় মহাকাশেই সেটাকে সারাই করার জন্য! এবারে ওয়েবের কথা ভাবুনঃ এরকম অস্বাভাবিক জটিল যন্ত্রটিকে মহাকাশে এতটা দূরত্বে পাঠানো হবে যে সেখানে গিয়ে সারাইয়ের কোন সুযোগ নেই। একটা ক্ষুদ্রতম গণ্ডগোল মানেই ২০ টি দেশের হাজার হাজার বিজ্ঞানীর ২৫ বছরের পরিশ্রম আর ১০০০ কোটি ডলার এক নিমেষে পণ্ড!
মিররের টেস্টিং চলছে
সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় ওয়েবের মিরর
৩) ক্যামেরা ও স্পেকটোগ্রাফঃ {বিস্তারিত লিখছি না}
ওয়েবের NIRCam (Near InfraRed Camera):
NIRSpec (Near InfraRed Spectograph):
MIRI (Mid InfraRed Instrument) (model):
মহাকাশে অবস্থানঃ সূর্য-পৃথিবী L2 point এর কাছে।
উৎক্ষেপণ ও স্থাপনের পরিকল্পনাঃ
সবশেষে দুটি সুন্দর ভিডিও রইল এর সংক্ষিপ্ত পরিচয় এবং কীভাবে উৎক্ষেপণের পর একে স্থাপন ও চালু করা হবেঃ (জটিলতাটা খুব ভালভাবে অনুভব করা যাবে এটা থেকে যেটা এই উত্তরে প্রায় কিছুই বোঝাতে পারিনি)
Comments
Post a Comment